অচেনা মানুষ

Estimated read time 1 min read

“পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে পিঠা বানাচ্ছি, আপিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে সোজা আমার এখানে চলে আসবেন, আপনার পিঠা খাওয়ার নেমন্তন্ন রইলো”। এক বন্ধু এভাবে আমন্ত্রণ জানালো, এই আন্তরিকতা আমি প্রত্যাখ্যান করতে পারলাম না। সম্মতি জানালাম ফোনে, “আমি আসবো”।

সময় মত পৌঁছে গেলাম। চা খেতে খেতে আড্ডা জমে উঠেছে, এ গল্প সে গল্প করতে করতে হঠাৎ কানে এলো দরোজার ঘণ্টা। দরোজা খুলে দিতেই এক মধ্য বয়সী মোটাসোটা মানুষ ঘরে ঢুঁকলেন। বন্ধুর মেয়ের মাস্টার মশাই উনি। মেয়ে ও মাস্টার মশাই চলে গেলেন পাসের ঘরে, আমারা বসার ঘরে সেই একই ভাবে আবার আড্ডায় বেস্ত হয়ে পড়লাম।

একটু পরে এক থালা পিঠে চলে এলো আমার সামনে, সঙ্গে এক পেয়ালা পায়েস। নারকোলের ঝামেলা এড়াতে খোয়া খির দিয়ে পাটিসাপটা, মালপোয়া আর নলেন গুঁড়ের পায়েস। লজ্জার মাথা খেয়ে আমি খাওয়া শুরু করলাম মাথা নিচু করে। আড্ডায় তাল দিতে মুখ দিয়ে শুধু হু-হে শব্দ ছাড়া আর কোন উত্তর দিতে পারলাম না। সব চেটেপুটে খেয়ে, ভদ্রতা বজায় রেখে একটা মালপোয়া থালায় রেখে দিলাম। ইচ্ছা ছিলো সেটিও খেয়ে ফেলার, কিন্তু ভদ্রতা আমাকে পরাস্ত করলো।

ভদ্রতার খাতিরে বললাম, আপনার মেয়ের মাস্টার মহাশয় তাহলে আজ জলখাবারে পিঠে খাবে। উত্তরে যা পেলাম, সেটাই এই গল্পের মূল উৎস। বন্ধুর অনু গল্প শুরু হলো। মাস্টার মহাশয় যখন প্রথম দিন পড়াতে এলেন, সেদিন গৃহকত্রী মেয়ের মাস্টার মহাশয়ের জন্য জলখাবার করে নিজে হাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। জলখাবার দেখে মাস্টার মহাশয় আর পাঁচটা গ্রহশিক্ষকের মত মেকি হাসি দিয়ে বলেনি, “এসবের কি প্রয়োজন ছিল!”

মাস্টার মহাশয় মুখে একটা স্বাভাবিক হাসি নিয়ে বলেছিলেন, “ আমাকে ক্ষমা করবেন, এ জলখাবার আমি খেতে পারবো না”। জলখাবার না খাওয়ার পিছনে উনি যে যুক্তি দেখালেন, তা একটু আজকালকার যুগে বেমানান। উনি বললেন, “দেখুন, আপনি আমার জন্য জলখাবার এনেছেন, তাতে আমি খুশি। কিন্তু এ আমি খেতে পারবো না। কারন, এই টুকু সময়ের জন্য আমি পড়াতে আসি, জলখাবার খেয়ে সময় নষ্ট করবো না। তবে খেতে খেতেও পড়ানো যায়, কিন্তু তা আমি করতে পারবো না। এতে ছাত্রীর পড়ায় মন সংযোগ নষ্ট হবে। শিক্ষক পড়াতে বসে জলখাবার খাবে, আর ছাত্রী মন দিয়ে পড়বে, এটা বাস্তবে সম্ভব না। আমাকে ক্ষমা করবেন”।

অনু গল্প শুনে ভালো লাগলো। আমার মনে ওনার জন্য শ্রদ্ধা জন্মালো। একবার ইচ্ছা হলো পড়িয়ে ফিরে যাওয়ার সময় একটু আলাপ করে দেখব এমন চমৎকার মানুষের সাথে। কিন্তু পরে ভাবলাম এটা হয়তো একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। উনি হয়তো ব্যাপারটা ভালো ভাবে নিতে পারবেন না। আমার আবার আড্ডায় মন দিলাম। একথা সেকথায় সময় কেটে গেলো। পড়ার ঘরের দরোজা ঠেলে প্রথমে ছাত্রী বেরিয়ে এলো, তার পিছনে পিছনে মাস্টার মহাশয়।

পৌষ সংক্রান্তি উপলক্ষে গৃহকত্রীর অনুরধে মাস্টার মহাশয় আবার ঘরে বসলেন। ছাত্রী মাস্টার মহাশয় কে পিঠে আর জল দিলেন। মাস্টার মহাশয় খেলেন তৃপ্তি করে। খাওয়া শেষে মাস্টার মহাশয় কে বাইরে দরোজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ছাত্রী দৌড়ে ফিরে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললো, “জানো মা, মাস্টার মহাশয় আঙ্কেল কে চেনে বললো। ফেসবুকে দেখেছে, বারাসাত অনলাইনে গ্রুপে”।

পরে জেনেছিলাম, গৃহকত্রী এই মাস্টার মহাশয় কে খুঁজে পেয়েছিলেন ফেসবুকের গ্রুপ থেকে। ভেবে কেমন অবাক লাগলো, এক ঝাক মানুষ আমারা, সকলেই অচেনা আবার সকলেই পরিচিত। হয়তো মাস্টার মহাশয়ের সাথে আলাপ করলে উনি খুশিই হতেন।

+ There are no comments

Add yours