টকাস করে টাকি

Estimated read time 1 min read

শুনুন মশাই, অত ভনিতা করে ভ্রমণ কাহিনী লিখতে বসিনি। আমার অলস মস্তিস্কের কিছু হিজিবিজি লেখা নিজের জন্য লিখে রাখি। বয়স কালে এগুলো পড়ে স্মৃতিচারণ করবো বলে। ২৪ সে ডিসেম্বর ২০২৩ আমার কয়েকজন উঠলো বাই কটক যাই এর মত করে টকাস করে টাকি পৌঁছে গিয়েছিলাম। সকাল ৭ টায় অ্যালার্ম লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম আগের রাতে। সকালে উঠে রিস্ক নিলাম না, পেট খালি করে স্নান বাদ দিয়ে কোষে সুগন্ধি মেখে নিলাম। টোটো নিয়ে ১২ টাকা দিয়ে পৌছে গেলাম বারাসাত জংশনে। বিভূতিভূষণ বাবুর লেখায় যেমন বারে বারে রানাঘাট স্টেশনের উল্লেখ পাবেন, তেমন আমার এই হিজিবিজি লেখায় বারাসাত জংশন কে পাবেন না। বেশ কয়েক মাস হয়ে গেলো বারাসাত জংশনে চলমান সিঁড়ি লাগিয়েছে। এখনো পর্যন্ত সে সিঁড়ি চড়ার আমার সৌভাগ্য হয়নি। যেদিনই যাই যখনই যাই এটা বন্ধ থাকে। পাঠকদের মধ্যে এমন কেউ যদি থেকে থাকেন যিনি এই স্বর্গীয় সিঁড়ি চলতে দেখেছেন বা চড়েছেন একটু দয়া করে কমেন্ট করবেন।

বারাসাত জংশন পৌঁছে দেখি হাসনাবাদ লোকাল দাড়িয়ে আছে ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। ঘড়িতে তখন ৭টা ৫০, ট্রেন ছাড়বে ৭টা ৫২ তে, হাতে মাত্র ২ মিনিট। এদিকে মায়াবী চলমান স্বর্গের সিঁড়ি চলছে না। ২ সেকেন্ডে হিসাব করে বুঝলাম ফুট ব্রিজ দিয়ে উপরে উঠে যেতে যেতে ট্রেন ছেড়ে দেবে। জীবনে প্রচুর কিক প্রয়োজন, কিক নিয়ে নিলাম। ১ নম্বরে তখন অচেনা এক ট্রেন দাড়িয়ে। উঠে পড়লাম তাতে। এক লাফে এ ট্রেন থেকে ও ট্রেন, আমি পৌঁছে গেলাম হাসনাবাদ লোকালে। হিসাব করে দেখলাম বছর ২০ পর আমি এমন একটা লাফ দিলাম। নিজেকে কেমন যেনো জোয়ান জোয়ান লাগছে তখন। ঝুলে পড়া ভুঁড়ি তখনো অনেকটা ভিতরে টেনে রেখেছি, জীম করা ছেলেদের মত বুকটা ফুলিয়ে, হাত দুটো একটু উঁচিয়ে রেখেছি। বেশ একটা হনু হনু ভাব। কচিকাঁচারা সবাই দেখলাম একে একে কামরায় উঠে এলো। মোট ১২ জন আমরা। ঠিক সময় ট্রেন ছাড়লো না। ছাড়লো ৮ টার অনেক পরে।

দইওআলা: দই, দই ভালো দই!
আমি: দইওআলা, দইওআলা, দইওআলা!
দইওআলা: ডাকছ কেন? দই কিনবে?
আমি: কেমন করে কিনব! আমার তো ৫০০ টাকা খুচরো নেই।
দইওআলা: কেমন ছেলে তুমি। ৫০০ টাকা খুচরো না নিয়ে তুমি হাসনাবাদ লোকালে উঠেছো?
আমি: তোমার কাছে UPI QR code আছে?
দইওআলা: ভাই, আমার সাথে নাটক করছো? কেমন ছেলে তুমি। কিনবে না তো আমার বেলা বইয়ে দাও কেন?

পকেট হাতড়ে খুচরো টাকা পেলাম, শেষমেশ দই খেলাম। আমি ২ ভাঁড় খেয়ে ফেললাম। লোক মুখে যেমন শুনেছিলাম, তেমন আহামরি দই না। অতি সাধারণ দই। দই টই খেয়ে সবে হাত মুখ মুছে রূমাল পেছনের পকেটে গুঁজে রাখলাম, ওমনি আমীনূর ব্যাগ খুলে ২ টি টিফিন বক্স ম্যাজিকের মত আমাদের সামনে তুলে ধরলো। একটিতে ফ্রেঞ্চ টোষ্ট, যার ডাক নাম ডিম পাউরুটি ভাঁজা। অন্যটিতে নারকোল ভাঁজা পিঠে। ২ বাক্স খাবার নিমেষে ফাঁকা হয়ে গেলো। আবার আমি হাত মুখ মুছে রূমাল পেছনের পকেটে গুঁজে রাখলাম। আড্ডা ইয়ার্কি করতে করতে উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা না ঘটিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম টাকি স্টেশনে।

টাকি স্টেশন থেকে টোটো নিয়ে ঘাটে যাচ্ছিলাম। জলখাবারের জন্য একটা ভালো দোকানে দাড়াতে বলায় টোওয়ালা এই কলীকা মিষ্টান্ন ভান্ডারে দাড়ালো। দালাল টোটোওয়ালা আমাকে নামিয়ে দোকান মালিকের সাথে hi hello করে চলে গেলো। গরম গরম লুচি আর ছোলার ডাল আলু তরকারি। কিন্তু আমাকে দিলো না। আমাকে দিলো ঠান্ডা লুচি (নুচি) আর ঠান্ডা তরকারি। ২ বার লুচি পাল্টে দিতে বললাম। মালিক ও কর্মচারী কথা কানেই নিলো না। গরম ফোলা লুচি কিন্তু সামনে সাজিয়ে রাখা আছে, তবুও আমাকে দিলো না।

এদিকে আমাদের দলের আরো ১১ জনকে এই দোকানে আসার জন্য ডেকে নিয়েছিলাম। তারাও এসে দোকানের সামনে ভিড় করেছে। দোকান মালিক আর কর্মচারী আমাকে ছেড়ে তাদের দিকে দৌড়ালো অ্যাপায়ন করতে। আমি একটা ঠান্ডা নুচি খেয়ে উঠে পড়লাম। আমাদের ১১ জন পায়ে পায়ে দোকানে ঢুকছিলো, দোকানের কর্মচারী সবাইকে এগিয়ে এনে টেবিলে সবাইকে বসাবার তোড়জোড় করছিলো। আমাকে না খেয়ে উঠে আসতে দেখে দলের সবাই জিজ্ঞাসা করলো, কেস কি? আমি বললাম, এরা গরম লুচি দেখিয়ে বাসি ঠান্ডা নুচি দিচ্ছে, পাল্টে দিতে বললে কানে নিচ্ছে না। আমি সবাইকে খেতে বরণ করলাম। এই বার দোকান মালিক আর কর্মচারীর টনক নড়লো।

না খাওয়া নুচির দাম মিটিয়ে সবাইকে নিয়ে দোকানের বাইরে চলে এলাম। দোকানের ছবি তুললাম, নুচির ছবি আগেই তুলেছিলাম। চালাক দোকান মালিক এবার আমার দিকে মন দিলো। আমাকে মিষ্টি ভাবে ডাকলেন, আমি গেলাম না। দোকানের সামনেই জটলা পাকালাম। দলের ১১ জন কে প্রায় ২২ বার ব্যাপারটা জোরেজোরে বললাম। অন্য গ্রাহকরাও শুনলো। অনকে চলে গেলো। অনেকে ঠান্ডা নুচি খেতে ঢুকলো। দোকানের ডাকে আমরা ১২ জন আর সাড়া দিলাম না, চলে গেলাম পাশের দোকানে। সেখানে গরম ফুলকো লুচি আর ঘুগনি খেলাম।

সকালের প্রাতঃরাশ শেষে করে হাটিহাটি পায়েপায়ে পৌঁছে গেলাম টাকি গেস্ট হাউসে, এখানে মধ্যাহ্নভোজনের বায়না দিতে হবে। চিংড়ি আর ভেটকির লড়াইয়ে ভেটকি জয়ী হলো। ১২ প্লেট ভেটকি ভাত বায়না করলাম ২৪০০ টাকায়। হলুদ রঙের একটি রসিদ লিখে দিলো ওরা। রসিদ অনিকের জিম্মায় দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম অসৎ টোটোওয়ালার খোঁজে। অকেন খুঁজে ৩ অসৎ টোটোওয়ালা খুঁজে পেলাম। আমরা ১২ জন, টোটো পিছু ৪ জন ৪০০ টাকা। শুধু মাত্র গোলপাতার জঙ্গলে নিয়ে যাবে আর নিয়ে আসবে। রাস্তার কয়েকটা দর্শনীয় স্থান পড়বে, সেগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে। প্রথমে রাস্তায় পড়লো জোড়া মন্দির। এখানে ছবি তুলে সোজা মিনি সুন্দর বন না গোলপাতার জঙ্গল।

হইহই করে এমাথা অমাথা করলাম গোলপাতার জঙ্গলে। একটি ওয়াচ টাওয়ারেও উঠলাম। ইছামতীয়ের তিরে কিছুখন সময় কাটালাম, ছবি তুললাম, হাসি ঠাট্টা করতে করতে সময় কেটে গেলো। এবার গেস্ট হাউসে ফেয়ার পালা। তিন টোটো ভরিয়ে আমরা রওনা দিলাম। রাস্তায় একটি টোটো দলছুট হয়ে গেলো। ফেরার পথে কয়েকটি স্পট দেখলাম। রায় চৌধুরীদের বাড়ি, কয়েকটা সিনেমার শুটিং স্পট ইত্যাদি। রাজবাড়ির ঘাটে পৌঁছে সুনালাম দলছুট অসৎ টোটোওয়ালা ফেরার পথে কিছুই দেখাইনি। আমাদের জনআদালত রায় দিলো, যে এই টোটোওয়ালা কে ১০০ টাকা জরিমানা করা হোক, অর্থাৎ ৪০০ টাকার পরিবর্তে তাকে ৩০০ টাকা দেওয়া হোক। টোটোওয়ালার তখন অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মত অবস্থা।

আপাতত এই পর্যন্ত। গল্পের পরবর্তী অংশ ব্রেকের পর।

+ There are no comments

Add yours